এমনি আয়নায় শুধু মানুষের বাইরের প্রতিচ্ছবিই দেখা যায়, কিন্তু আমার বন্ধু শিল্পী আবুল মনসুর যে আয়না তৈরী করেছেন, তাতে মানুষের অন্তরের রূপ ধরা পড়েছে। যে সমস্ত মানুষ হরেক রকমের মুখোস পরে আমাদের সমাজে অবাধে বিচরণ করছে, আবুল মনসুরের আয়নার ভেতরে তাদের স্বরূপ-মূর্তি বন্য ভীষণতা নিয়ে ফুটে উঠেছে । মানুষের মুখোস – পরা এই বহুরূপী বনমানুষগুলোর সবাইকে মন্দিরে , মসজিদে , বক্তৃতার মঞ্চে , পলিটিক্সের আখড়ায় , সাহিত্য সমাজে যেন বহুবার দেখেছি বলে মনে হচ্ছে। অন্যান্য ভাষার সাহিত্যে ব্যঙ্গ – রচনার যা কদর আছে , দুর্ভাগ্যবশতঃ আমাদের সাহিত্যে তা নেই।ইংরেজী সাহিত্যে জেরোম ও বার্ণার্ড শ’র সুউচ্চ আসনই ইংরেজী পাঠক – সাধারণের রসগ্রাহিতার প্রমাণ দিচ্ছে। শুধু ইংরেজী সাহিত্যে নয় , সমৃদ্ধিশালী সমস্ত সাহিত্যেই ব্যঙ্গ সৃষ্টি অভিনন্দিত হয়েছে।
ইউরোপীয় সমস্ত সাহিত্যই ‘ ল্যাম্পুন ‘ ও ‘ স্যাটায়ার’এ সমৃদ্ধিশালী এবং তার স্রষ্টারা বিশেষ সম্মানের অধিকারী। বাঙলা ভাষায় ব্যঙ্গ – সাহিত্য খুব উন্নত হয়নি ; তার কারণ , ব্যঙ্গ – সৃষ্টিতে অসাধারণ প্রতিভার প্রয়োজন । এ যেন সেতারের কান মলে সুর বের করা — সুরও বেরুবে , তারও ছিড়বে না । আমি একবার এক ওস্তাদকে লাঠি দিয়ে স্বরোদ বাজাতে দেখেছিলুম । সেদিন সেই ওস্তাদের হাত সাফাই দেখে তাজ্জব হয়েছিলুম । আর আজ বন্ধু আবুল মনসুরের হাত সাফাই দেখে বিস্মিত হলুম । ভাষার কান মলে রস – সৃষ্টির ক্ষমতা আবুল মনসুরের অসাধারণ । এ যেন পাকা ওস্তাদী হাত!
আবুল মনসুরের ব্যঙ্গের একটা অসাধারণ বৈশিষ্ট্য এই যে, সে ব্যঙ্গ যখন হাসায়, তখন হয় সে ব্যঙ্, কিন্তু কামড়ায় যখন, তখন হয় সে সাপ; আর সে কামড় গিয়ে যার গায়ে বাজে, তার মুখের ভাব হয় সাপের মুখের ব্যাঙের মতই করুণ! কিন্তু সে হাসির পিছনে যে অশ্রু আছে, সে কামড়ের পিছনে যে দরদ আছে, তা যাঁরা ধরতে পারবেন, আবুল মনসুরের ব্যঙ্গের সত্যিকার রসোপলব্ধি করতে পারবেন তাঁরাই। বন্ধুবরের এ রসাঘাত কশাঘাতেরই মত তীব্র ও ঝাঁঝালো। কাজেই এ – রসাঘাতের উদ্দেশ্য সফল হবে , এটা নিশ্চয়ই আশা করা যেতে পারে। বন্ধুর আয়নার এই- ই আমার ফ্রেম।
কাজী নজরুল ইসলাম
তথ্য নির্দেশ
১. আবুল মনসুর আহমদের আয়না; ড . নুরুল আমিন সম্পাদিত