Banglasahitta

Welcome to Banglasahitta

One Step to the Heart

Banglasahitta

Welcome to Banglasahitta

One Step to the Heart

চর্যাপদের ভাষাকে সন্ধ্যা ভাষা বলা হয় কেন? চর্যাপদের ভাষার বৈশিষ্ট্য ও ভাষা বিতর্কের সমাধান!

বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগের একমাত্র নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক নিদর্শন চর্যাপদ। চর্যাপদের প্রায় সমসাময়িক বাংলাদেশের যেসব সংস্কৃত-প্রাকৃত-অপভ্রংশ সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছিল সেগুলো প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের প্রত্যক্ষ উপকরণ নয়। কিন্তু চর্যাপদ আবিষ্কারের মাধ্যমে বাংলা ভাষার আদি স্তরের লক্ষণ সম্পর্কে অবহিত হওয়া সম্ভব হয়েছে। চর্যাপদের মাধ্যমে প্রাচীন বাঙালির জীবন ও সাধনা সম্বন্ধে অনেক রহস্যের সমাধান ঘটেছে। তাই বলা যায়, চর্যাপদ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আদি নিদর্শন।

চর্যাপদের ভাষা ও ভাষা বিতর্কের সমাধান: চর্যাপদের ভাষাকে সান্ধ্যভাষা বলা হয়। চর্যাপদগুলো সান্ধ্যভাষায় রচিত। যে ভাষা সুনির্দিষ্ট রূপ পায়নি, যে ভাষার অর্থও একাধিক অর্থ্যাৎ আলো আধারের মতো, সে ভাষাকে পন্ডিতগণ সান্ধ্য ভাষা বলেছেন।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এ ভাষা সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, ‘আলো আঁধারি ভাষা, কতক আলো, কতক অন্ধকার; খানিক বুঝা যায়, খানিক বুঝা যায় না; যাঁহারা সাধন ভজন করেন তাঁহারাই সে কথা বুঝিবেন আমাদের বুঝিয়া কাজ নেই’। ‘আমরা সাহিত্যের কথা কহিতে আসিয়াছি, সাহিত্যের কথাই কহিব।

কারও মতে ‘সন্ধ্যাদেশ’ নামে বিশেষ অঞ্চলের ভাষার সঙ্গে চর্যাপদের ভাষার মিল আছে বলে এ নাম হয়েছে।

বাংলা ভাষার উদ্ভব যুগের এক প্রকার দ্ব্যর্থক শব্দযুক্ত ভাষা ব্যবহৃত হয় চর্যাপদে। এর ভাষা হেঁয়ালিপূৰ্ণ, কিছুটা স্পষ্ট, কিছুটা অস্পষ্ট। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এর ভাষাকে বলেছেন ‘সান্ধ্যা ভাষা’ সুকুমার সেনের মতে ‘সন্ধ্যা’ শব্দটিতে প্রকটভাবে রয়েছে ধ্যৈ বা ‘ধা’ ধাতুর অর্থ। যে ভাষায় অভীষ্ট অর্থ বুঝতে হয় অনুধাবনের মাধ্যমে বা মর্মজ্ঞ হয়ে অথবা যে ভাষায় ভাবার্থ বিশেষভাবে গুপ্ত [সম্+ধা] তা- ই সান্ধ্যা ভাষা। বস্তুত পদগুলোর রচয়িতাগণ ছিলেন বৌদ্ধ সাধক। তাঁরা সাধনা করতেন গোপন তত্ত্বের। আসলে তন্ত্রের সাধনা ছিল অনেকাংশে গূঢ় বা গোপন। এ সাধনা যাতে সাধারণ লোকের হাতে পড়ে বিকৃত না হতে পারে সেজন্য সান্ধ্যভাষার ব্যবহার হতো। চর্যাপদে এ উদ্দেশ্যে পারিভাষিক শব্দের প্রয়োগ হয়েছে। চর্যার অনেক বর্ণনা আক্ষরিকভাবে এক অর্থ, আবার যোগসাধনার দিক থেকে ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে।

চর্যাপদ যেই সময়ে রচিত হয়েছিল সেই সময়ে বাংলা ভাষা তার পুরো রূপ লাভ করেনি। চর্যাপদের ভাষা প্রাচীন বাংলা বলে তখনকার ভাষার প্রাচীনত্বের দরুন গৌড় অপভ্রংশের প্রভাব এতে রয়ে গেছে। ফলে কেউ কেউ অপভ্রংশ, প্রাচীন হিন্দি, মৈথিলি, উড়িয়া বা আসামি ভাষা বলে দাবি করেন। একই গোষ্ঠিজাত বলে এসব নব্য ভারতীয় আর্যভাষার সঙ্গে চর্চাপদের ভাষার মিল আছে। ফলে চর্যাপদ নিয়ে এই ভাষা বিতর্ক।

মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সুনীতিকুমার, সুকুমার সেন, প্রবোধচন্দ্র বাগচী এবং আরো অনেক পণ্ডিতগণ মনে করেন চর্চাপদের ভাষা বাংলা। তাঁরা মনে করেন চর্চাপদ বারো শতকের মধ্যে রচনা হয়েছিল। এ সময় পর্যন্ত বাংলা ভাষা তার স্বকীয় মর্যাদা লাভ করেনি। তের শতকের পর উড়িয়া ভাষা ও ষোল শতকের পর আসামি ভাষা বাংলা ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয় । এ অবস্থার প্রেক্ষিতে চর্যাপদের উপর কোনো বিশেষ অঞ্চলের বা বিশেষ কোনো ভাষার দাবি স্বীকার করা যায় না। কিন্তু ভাষা বিচারের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করলে একে বাংলা ছাড়া আর কিছুই বলা যাবে না।
তবে ড . সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় তার ODBL গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে চর্যাপদের ধ্বনিতত্ত্ব, ব্যকরণ ও ছন্দ বিচার করে সিদ্ধান্ত করেছেন যে, চর্যার পদ সংকলনটি আদিতম বাংলা ভাষায় রচিত।
সর্বোপরি বলা যায়, চর্যাপদের সাথে বাংলাভাষার ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব, বাক্যতত্ত্ব ও বাগর্থতত্ত্বের যে মিল পাওয়া যায় তাতে প্রমাণিত হয় যে চর্যাপদ বাংলা ভাষায় রচিত।
সহায়ক গ্রন্থ:
১. মুহম্মদ আবদুল হাই ও আনোয়ার পাশা (সম্পাদিত): চর্যাগীতিকা
২. গোপাল হালদার: বাংলা সাহিত্যের রূপরেখা (১ম খণ্ড)
৩. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্: বাংলা সাহিত্যের কথা
৪. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়: Origin and Development of Bengali Language
৫. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়: বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত (১-২ খণ্ড)
৬. দীনেশচন্দ্র সেন: বঙ্গভাষা ও সাহিত্য
৭. সুকুমার সেন: বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস (১-২খণ্ড)
৮. মাহবুবুল আলম: বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস
৯. ড. সৌমিত্র শেখর: বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা

আর্টিকেল’টি ভালো লাগলে আপনার ফেইসবুক টাইমলাইনে শেয়ার দিয়ে দিন অথবা পোস্ট করে রাখুন। তাতে আপনি যেকোনো সময় আর্টিকেলটি খুঁজে পাবেন এবং আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করবেন, তাতে আপনার বন্ধুরাও আর্টিকেলটি পড়ে উপকৃত হবে।

গৌরব রায়

বাংলা বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট, বাংলাদেশ।

লেখকের সাথে যোগাযোগ করতে: ক্লিক করুন

6.7k

SHARES

Related articles

প্রমথ চৌধুরী এর জীবন ও সাহিত্যকর্ম

প্রমথ চৌধুরী (৭ আগস্ট ১৮৬৮ — ২ সেপ্টেম্বর ১৯৪৬) বাংলা সাহিত্যের একটি উজ্জ্বল নাম। তিনি প্রাবন্ধিক, কবি ও ছোটগল্পকার হিসেবে পরিচিত। তার পৈতৃক নিবাস বর্তমান

Read More
সাহিত্যে অস্তিত্ববাদ : অস্তিত্ববাদ কী? অস্তিত্ববাদের বৈশিষ্ট্য ও জ্যাঁ পল সার্ত্রের অস্তিত্ববাদ, হাইডেগারের অস্তিত্ববাদ, কিয়ের্কেগার্দ, জেসপার্স, মার্সেলের অস্তিত্ববাদ

সাহিত্যে অস্তিত্ববাদ : অস্তিত্ববাদ কী? অস্তিত্ববাদের বৈশিষ্ট্য ও জ্যাঁ পল সার্ত্রের অস্তিত্ববাদ, হাইডেগারের অস্তিত্ববাদ, কিয়ের্কেগার্দ, জেসপার্স, মার্সেলের অস্তিত্ববাদ

অস্তিত্ববাদ অস্তিত্ববাদ একটি দর্শন। দার্শনিক চিন্তার শুরু থেকেই বাস্তববাদ, ভাববাদ, জড়বাদ, যান্ত্রিকবাদ প্রভৃতি দার্শনিক মতবাদগুলো মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কীয় বাস্তব সমস্যার পরিবর্তে বস্তু, ঈশ্বর, তত্ত্ব বা

Read More
নিজের আপন মাকে বিয়ে করল ইডিপাস; শয্যাসঙ্গী হয়ে জন্ম দিল চার সন্তানের

নিজের আপন মাকে বিয়ে করল ইডিপাস; শয্যাসঙ্গী হয়ে জন্ম দিল চার সন্তানের

“বিধির লিখন যায় না খনন” – বিধি অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তা যার ভাগ্যে যা লিখে রেখেছেন তা কখনো খন্ডন করা যায় না সর্ব প্রকার চেষ্টা বা সাধনার

Read More
Gourab Roy

Gourab Roy

I completed my Honors Degree in Bangla from Shahjalal University of Science & Technology in 2022. Now, I work across multiple genres, combining creativity with an entrepreneurial vision.

বিশ্বসেরা ২০ টি বই রিভিউ

The content is copyright protected.